চট্টগ্রামে উন্নয়ন ও পরিবর্তনের সমন্বিত রূপরেখা তুলে ধরলেন তারেক রহমান

দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর চট্টগ্রামের মাটিতে ফিরে উত্তাল জনতার সামনে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নিয়ে সমন্বিত রূপরেখা তুলে ধরলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ইতিহাস-আবেগে ঘেরা চট্টগ্রামকে ঘিরে স্মৃতিচারণের পাশাপাশি তিনি কথা বলেন দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কৃষি ও শিল্পায়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, দুর্নীতি দমন ও পরিবেশ রক্ষার মতো জাতীয় ইস্যু নিয়ে। একইসঙ্গে তরুণ সমাজকে সামনে রেখে ব্যাংক ঋণ সহজ করা, স্টুডেন্ট লোন চালু এবং উদ্যোক্তা তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

রোববার (২৫ জানুয়ারি) নগরের পলোগ্রাউন্ড মাঠে অনুষ্ঠিত মহাসমাবেশে তারেক রহমানের বক্তব্য ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে বেশ উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা যায়। সমাবেশে যোগ দেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

এর আগে শনিবার (২৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় দলের প্রধান হিসেবে প্রথমবারের মতো চট্টগ্রামে পৌঁছান তারেক রহমান। সন্ধ্যায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে তিনি শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। সেখান থেকে তিনি সরাসরি নগরের পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লুতে যান এবং সেখানে রাত্রিযাপন করেন। রোববার (২৫ জানুয়ারি) সকালে তিনি তরুণদের সঙ্গে ‘দ্য প্লান ইউথ পলিসি টক উইথ তারেক রহমান’ শীর্ষক একটি মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। এতে চট্টগ্রামের ৫০টি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সাড়ে ৩০০ শিক্ষার্থী অংশ নেন।

ওই সভা শেষে দুপুরে তিনি চট্টগ্রাম নগরের পলোগ্রাউন্ড মাঠে আয়োজিত বিএনপির মহাসমাবেশে যোগ দেন। সমাবেশে সকাল থেকেই মাঠ ও আশপাশের এলাকায় নেতাকর্মীদের ঢল নামে। ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে যায় পুরো এলাকা। দুপুর ১টার দিকে উত্তাল জনতার সামনে বক্তব্য শুরু করেন তারেক রহমান।

বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, চট্টগ্রাম থেকেই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং এখানেই তিনি শহীদ হয়েছিলেন। এই চট্টগ্রামেই বেগম খালেদা জিয়াকে দেশনেত্রী উপাধি দেওয়া হয়েছিল। এই শহরের সঙ্গে আমি এবং আমার পরিবারের গভীর আবেগের সম্পর্ক রয়েছে।

তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে যেমন স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল, তেমনি ২৪-এর আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণ আবারও দেশকে রক্ষা করেছে। বাংলাদেশের মানুষ পরিবর্তন চেয়েছে- যে পরিবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত হবে।

রাজনৈতিক সমালোচনা ও বাস্তব উন্নয়নের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা চাইলে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের অনেক সমালোচনা করতে পারি, কিন্তু তাতে কারও পেট ভরবে না বা মানুষের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসবে না। বিএনপি একমাত্র দল, যারা যতবার ক্ষমতায় গেছে, ততবারই মানুষের জন্য কাজ করেছে।

দ্রব্যমূল্য ও কৃষি উৎপাদনের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করতে হলে উৎপাদন বাড়াতে হবে। এজন্য বিএনপি কৃষকদের কাছে কৃষক কার্ড পৌঁছে দিতে চায়, যাতে তারা বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা সহজে পেতে পারে।

জলাবদ্ধতা সমস্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, চট্টগ্রামের একটি বড় সংকট হলো জলাবদ্ধতা। বিভিন্ন খাল ও নালা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণেই এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। তাই বিএনপি পরিকল্পিতভাবে খাল কাটতে চায়।

শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান নিয়ে তারেক রহমান বলেন, চট্টগ্রামে একাধিক ইপিজেড রয়েছে, যেখানে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এসব ইপিজেড বিএনপির আমলেই গড়ে উঠেছিল। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জনগণ ভোট দিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতায় আনলে আরও নতুন ইপিজেড স্থাপন করা হবে। সব মিলিয়ে চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানীতে পরিণত করা হবে।

নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেকোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। যাতে মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে। অতীতে বিএনপি যখন দেশ পরিচালনা করেছে, তখন দলের কেউ অন্যায় করলেও তাকে ছাড় দেওয়া হয়নি। আগামীতে সরকারে গেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

দুর্নীতি দমন প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দুর্নীতি। বিএনপি দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরবে। অতীতে বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতি দমনে সক্ষম হয়েছিলেন। আগামী দিনেও দুর্নীতিবাজদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

তিনি বলেন, আগামী দিনে বিএনপির ওপর আস্থা রাখুন এবং ধানের শীষে ভোট দিন। ভোটের দিন ভোরে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে, ফজরের নামাজ শেষে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেবেন।

এর আগে, সকালে নগরের রেডিসন ব্লু হোটেলে মতবিনিময় সভায় তারেক রহমান বলেন, আমরা পরিকল্পনা নিয়েছি, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় জলাবদ্ধতা দূর করতে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করব।

একটু বৃষ্টি হলেই ঢাকা ও চট্টগ্রামে পানি জমে যায়। প্রায় বছরখানেক আগে বর্ডারের ওইপাশ থেকে পানি ছেড়ে দেওয়ার ফলে নোয়াখালী ও তার আশপাশের অঞ্চল পানিতে সয়লাব হয়ে যায়। কিন্তু পানি দুই সপ্তাহের বেশি ছিল না। এটাও জলাবদ্ধতার একটি অংশ, পানি কোথাও যেতে পারছে না।

তরুণ উদ্যোক্তাদের সহজে ঋণ দেওয়া প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশে বহু ছোট ছোট উদ্যোক্তা রয়েছে। আমাদের দেশে ব্যাংক লোন পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক জটিলতা রয়েছে। সহজেই ব্যাংক লোন পাওয়া যায় না। এজন্য আমরা যতটুকু সম্ভব সহজ করতে চাই। সেই পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। একইসঙ্গে যেসব শিক্ষার্থী বিদেশে পড়তে যায় তারা বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হন। কেউ সময়মতো ভিসা বা টিকিট কাটতে পারে না। তাদেরকে স্টুডেন্ট লোন কীভাবে দেওয়া যায় সে বিষয়ে কাজ করবে বিএনপি।

তারেক রহমান বলেন, আমাদের দেশে বিশেষ করে শহরাঞ্চলের বাতাস অনেক দূষিত। এই ছোট্ট দেশে প্রায় ২০ কোটি মানুষ বসবাস করে। কাজেই ২০ কোটি মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখার জন্য বায়ু দূষণের সঙ্গে আমাদের ফাইট করতে হবে। আমরা ৫ বছরে ৫০ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা করেছি।

তিনি বলেন, এখন অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন- এতো চারা কোথায় পাব? আমি তার উত্তরে বলবো, গাছ মূলত বর্ষা মৌসুমে লাগাতে হয়। আপনাদের এ সম্পর্কে ধারণা রয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় একটি করে হলেও নার্সারি রয়েছে। একটি নার্সারির চারা উৎপাদন ক্ষমতা ২০-২৫ হাজার মতো। আমরা যদি এই নার্সারির উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারি, তাহলে সহজে আমরা লক্ষ্যে পৌঁছে যাব।

উল্লেখ্য, তারেক রহমান সর্বশেষ ২০০৫ সালে চট্টগ্রাম সফর করেছিলেন। সে সময় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রচারণায় অংশ নিয়ে তিনি নগরীর লালদিঘী ময়দানে এক জনসভায় বক্তব্য দেন।

এসকে/এসএন

Share this news on:

সর্বশেষ

img
লালমনিরহাটে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষ, আহত ২০ Jan 25, 2026
img
বলিউডে ছবি না করার কারণ জানালেন সোনাম বাজওয়া Jan 25, 2026
img
ওমরা পালনে সৌদি আরবে মারিয়া মিম Jan 25, 2026
img
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, আমি জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ: রবিন Jan 25, 2026
img
আলোচনার মধ্যেই সৌদিতে ‘বাংলাদেশ’ দলের হয়ে খেললেন সাকিব Jan 25, 2026
img

নির্বাচনী প্রচারণা

জনগণের চলাচলে বিঘ্ন ঘটিয়ে সভা-সমাবেশ করা যাবে না: ইসি Jan 25, 2026
img
দেশে ফেরা ও বিসিবির সিদ্ধান্ত নিয়ে সাকিবের মন্তব্য Jan 25, 2026
img
‘সত্যের পক্ষে ছিলাম বলেই ২৪-এর আন্দোলনের পর মুক্ত বাতাস পেয়েছি’ Jan 25, 2026
img
দিল্লিতে হাসিনার বক্তব্যে ক্ষুব্ধ ঢাকা, শিষ্টাচার লঙ্ঘনের অভিযোগ Jan 25, 2026
img

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ নয়, সরকার অপরাধীদের জামিনের বিরুদ্ধে Jan 25, 2026
img
নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হয়নি : জি এম কাদের Jan 25, 2026
img
এবারের নির্বাচন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ও ভাগ্য নির্ধারণ করবে : নাহিদ ইসলাম Jan 25, 2026
img
ভোটে চাঁদাবাজ-জমিদারদের বিরুদ্ধে রায় দেওয়ার আহ্বান নাসীরুদ্দীনের Jan 25, 2026
img
দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে যত প্ল্যানই করি, কিছুই হবে না : তারেক রহমান Jan 25, 2026
img
বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের বাদ পড়া নিয়ে মুখ খুললেন জন্টি রোডস Jan 25, 2026
img
আমি কিভাবে ‘ভাই ব্যবসা’ করলাম, প্রশ্ন মীর স্নিগ্ধের Jan 25, 2026
img
ভয় দেখিয়ে যারা ক্ষমতায় আসতে চায়, তাদের পতন হাসিনার চেয়েও ভয়ঙ্কর হবে: সারজিস Jan 25, 2026
img
প্রকৃতি যেন জয়াকে আলাদা করে গড়ে তুলেছে : প্রসেনজিৎ Jan 25, 2026
img
ফরিদপুরে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপির তিন নেতা বহিষ্কার Jan 25, 2026
img
দুর্নীতি করব না, সহ্যও করব না : জামায়াত আমির Jan 25, 2026