দুবাইয়ের এক হোটেলের রান্নাঘরে পেঁয়াজ কাটছিলেন উসমান তারিক। পেঁয়াজের তেজস্ক্রিয়ায় চোখে পানি। লম্বা সময় বসে কাটতে হয়, পিঠেও জমেছে ব্যথা—এটাই ছিল তাঁর প্রতিদিনের রুটিন। শ্রমিকদের ছোট আবাসনে রাত পার, আর ভবিষ্যত ছিল অনিশ্চয়তা। সেই সময় হয়তো কল্পনা করতে পারননি একদিন এই কিচেন থেকে পৌঁছে যাবেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মঞ্চে।
ক্যামেরন গ্রিন যখন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে ব্যঙ্গ করে তাঁর বোলিং অ্যাকশন দেখাল, উসমান হয়তো ভাবল— ‘আবার কি শুরু!’ এক মাস আগে ইংল্যান্ডের ব্যাটার টম ব্যানটনও একই অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু মাঠের এই বিতর্ক তাঁকে বিচলিত করতে পারে না। কারণ জীবন তাঁকে ইতিমধ্যেই শিখিয়েছে— সে গ্ল্যাডিয়েটরের মতো, কঠিন সময় ও কঠিন পরিস্থিতিতে সবসময় লড়াই করে।
পেশোয়ারে বেড়ে ওঠা উসমান ছোটবেলা থেকেই দেখেছেন সংগ্রামের মুখ। বাবার মৃত্যু এবং আর্থিক সংকট তাঁকে ছোটবেলা থেকেই বড় ঝুঁকি নিতে শিখিয়েছে। কাজের খোঁজে তিনি আফগানিস্তানের কাবুল পর্যন্ত যান। দ্য ন্যাশনালকে উসমানের জীবন সংগ্রামের কথা বলছিলেন ছোটবেলার বন্ধু হাসিব উর রহমান, ‘তুষার পড়ছিল, মেঝেতে বরফ জমেছিল, আর সে চাকরি খুঁজছিল, বিভিন্ন কোম্পানি ঘুরছিল।’
উসমান সহায়তা চেয়েছিল, কিন্তু পরিস্থিতি তত সহজ ছিল না। হাসিব বলেন, ‘আমি আমার বসকে বলেছিলাম ওর জন্য কোনো জায়গা বের করতে, কিন্তু তিনি রাজি হননি। বললাম, আমি যে বেতন পাচ্ছি তার একটি অংশ ওর জন্য দিতে পারেন, অন্তত ওর মন শান্ত হবে। কিন্তু সেটাও কাজ হয়নি।’
পাকিস্তানে ফিরে আসেন উসমান, কিন্তু পরে আবার দুবাই পাড়ি দেয়। সোনাপুরের শ্রমিক আবাসনে হোটেলের রান্নাঘরে পেঁয়াজ কাটার দিনগুলো চলতে থাকে। হাসিব বলেন, ‘পেঁয়াজ কাটা সহজ নয়; চোখে পানি চলে আসে, পিঠেও ব্যথা শুরু হয়।’
পরের চাকরি আসে গাড়ির যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী সংস্থার ক্রয় বিভাগে। জীবিকা চলছিল, কিন্তু ক্রিকেটের আগ্রহ এখনও নিভে যায়নি। দুবাইয়ের দেইরার রাস্তার ছোট খেলার মাঠে হায়াত রিজেন্সির পাশে উসমান আবার ব্যাট-বল হাতে খেলতে শুরু করেন। তখনই ফাস্ট বোলিং ছেড়ে স্পিনে আসা। লম্বা গড়নের এই স্পিনার, যাঁকে কেউ আগে চিনতেন না, ধীরে ধীরে নিজের আবিস্কৃত বিরল অ্যাকশন ব্যাটারদের জন্য জুজু হয়ে ওঠে।
পিএসএলের ট্যালেন্ট হান্টে অংশ নেয়ার সুযোগ আসে উসমানের। প্রথম ছয় বলেই নির্বাচকদের নজর কাড়েন। কিন্তু চাকরির দায়ে তিনি যেতে পারেন না। তখন মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২০১৭ সালে, উদ্যম নিয়ে দুবাইয়ে চাকরি ছেড়ে পাকিস্তানে ফিরে আসেন, পুরোপুরি ক্রিকেটের জন্য।
হাসিব মনে করিয়ে দেন, ‘যখন সে সংযুক্ত আরব আমিরাত ছেড়ে যাচ্ছিল, আমি বলেছিলাম, আমি জানি না তুমি কভাবে বাঁচবে, কারণ তুমি যে চাকরি পেয়েছ সেটা সেরা সুযোগ। কিন্তু সে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করল—না, আমি আর পিছনে তাকাব না। চেষ্টা করব এবং আরও কঠোর পরিশ্রম করব। আমি অবশ্যই সফল হব।’
দেশে ফিরে দিন-রাত অনুশীলন করেন উসমান। কঠোর পরিশ্রমই বদলে দিয়েছে ভাগ্য। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে সাফল্যের পর পাকিস্তান দলে সুযোগ পান তিনি। দ্বিতীয় ম্যাচেই হ্যাটট্রিক। গত বছরে নভেম্বরে ত্রিদেশীয় সিরিজে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এই কীর্তি গড়েন। তারপর তো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছেন।
আইএলটি-টোয়েন্টির ফাইনালে ডেজার্ট ভাইপার্সের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বন্ধু হাসিব, যিনি এখন দুবাইয়ের একটি ফাইন্যান্স কোম্পানিতে হেড অফ কমপ্লায়েন্স, মাঠে বসে সব দেখেছেন। তিনি বললেন, ‘সে সবসময় পরিবারের জন্য কিছু করতে চেয়েছে। ক্রিকেট ছিল তার শেষ সুযোগ, শেষ চেষ্টা। আর সে সেটা করেছে।’
দুবাইয়ের রান্নাঘরের ছোট কিচেন থেকে শুরু হওয়া স্বপ্ন আজ আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছেছে। জীবন তাঁকে শিখিয়েছে লড়াই করতে, আর উসমান সেই লড়াইয়ে জয়ী হয়েছেন। কঠোর পরিশ্রম, দৃঢ় সংকল্প এবং আবেগ—এই তিনটি তাঁকে আজ পাকিস্তানের বড় ভরসার জায়গায় নিয়ে এসেছে।
এবি/টিএ