আমাদের দেশে সবচেয়ে গুরুত্বের সাথে যে রাতগুলো পালন করা হয়, তার মধ্যে একটি হলো ‘শবে বরাত’। ‘শবে বরাত’ মূলত ফারসি শব্দসমষ্টি, যেখানে ‘শব’ অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ অর্থ নাজাত বা মুক্তি; অর্থাৎ এর অর্থ হলো মুক্তির রজনী। তবে পবিত্র হাদিসের ভাষায় এই রাতকে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ বা অর্ধ শাবানের রাত (১৪ই শাবান দিবাগত রাত) বলা হয়েছে। যদিও পবিত্র কোরআনে এই রাতের ব্যাপারে সরাসরি কোনো নির্দেশনা নেই, তবে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাসূত্রে একাধিক হাদিসে এর ফজিলত প্রমাণিত হয়েছে।
বিখ্যাত সাহাবি মুয়াজ বিন জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী কারিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলা এই রাতে তাঁর সৃষ্টির দিকে রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করে দেন। (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৩৯০)। হাদিসবিশারদদের মতে, এই হাদিসটি সহিহ বা বিশুদ্ধ।
সালাফদের দৃষ্টিতে এই রাতের মর্যাদা পূর্ববর্তী মুসলিম মনীষী বা সালাফদের নিকটও এই রাতটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ইবনে ওমর (রা.)-এর মতে, পাঁচটি রাতে দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না, যার মধ্যে শাবানের ১৪ তারিখের রাত অন্যতম। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক)। খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) এবং ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-ও এই রাতে দোয়া কবুল হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন এবং একে মুস্তাহাব আমল হিসেবে গণ্য করেছেন। (আত-তালখিসুল হাবির, ইবনে হাজার : ২/১৯১, আল-ইতিবার, পৃ: ১৪৩)
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর মতে, এই রাতের ফজিলত অনস্বীকার্য এবং অনেক সালাফ এই রাতে বিশেষ ইবাদত করতেন। তবে সম্মিলিত ইবাদত পরিহারযোগ্য। (আল ফাতওয়াল কুবরা, ইবনে তাইমাি : ১/১৩০১)
আমল ও ইবাদতের পদ্ধতি : শবে বরাতের ইবাদত মূলত ব্যক্তিগত নফল ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। তাই এ নিয়ে খুব বাড়াবাড়ি বা একদম ছাড়াছাড়ি করা উচিত নয়। হাদিস ও সালাফদের বর্ণনা থেকে এই রাতের করণীয় কিছু আমল নিচে আলোচনা করা হলো:
১. নফল নামাজ: নফল নামাজে দীর্ঘ কিরাত ও লম্বা সিজদা করা এই রাতের একটি বিশেষ আমল। আম্মাজান আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে দেখা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) এই রাতে এত দীর্ঘ সময় সিজদায় ছিলেন যে তিনি ইন্তেকাল করেছেন বলে ধারণা হয়েছিল। (শুআবুল ঈমান, হাদিস : ৩৫৫৪)
২. তাওবা ও ইস্তিগফার: ইমাম ইবনে রজব (রহ.)-এর মতে, এই রাতে মুমিনের উচিত খাঁটি মনে তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা। যেহেতু এই রাতে আল্লাহ প্রথম আকাশে নেমে বান্দাদের ক্ষমা করেন, তাই বেশি বেশি ইস্তিগফার করা জরুরি। (লাতাইফুল মাআরিফ, পৃ: ১৫১-১৫৭)
৩. কোরআন তিলাওয়াত ও জিকির: নফল নামাজের পাশাপাশি পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত এবং জিকির-আজকারে মশগুল থাকা এই রাতের অন্যতম আমল হতে পারে। কেননা এগুলোর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারে।
৪. পরের দিন রোজা রাখা: আলী (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে ১৫ই শাবানের দিনে রোজা রাখার কথা বলা হয়েছে। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৩৮৮)। যদিও এই হাদিসের সনদ কিছুটা দুর্বল, তবে ফজিলতপূর্ণ বিষয়ে এটি আমলযোগ্য। তা ছাড়া আইয়ামে বিজ (প্রতি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ) এবং শাবান মাসে বেশি রোজা রাখার সহিহ হাদিসের ভিত্তিতেও এই রোজাটি তাত্পর্যপূর্ণ। তবে উত্তম হলো ১৫ তারিখের সাথে আগে বা পরে আরও একটি রোজা মিলিয়ে রাখা।
৫. কবর যিয়ারত : সম্ভব হলে কবর যিয়ারতও করা যেতে পারে। কেননা আয়েশা (রা.) সূত্রে বর্ণিত একটি হাদিসে পাওয়া যায় যে এ রাতে মহানবী (সা.) জান্নাতুল বাকিতে গিয়ে মৃতদের জন্য দোয়া করেছেন। (বায়হাকি) তবে শায়খ আলবানি (রহ.)-এর মতে এই হাদিরে সনদ দুর্বল।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হয়ে সাধ্যমতো এই রাতের ফজিলত অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
এবি/টিএ