ক্লান্ত দেহে বাসায় ফিরি, পকেটে থাকে ভালোবাসার নীরব দলিল: নাহিদ ইসলাম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থীরা ছুটছেন ঘর থেকে ঘরে, সড়ক থেকে দোকান সবখানেই তাদের সরব প্রচারণা। ভোট টানার জন্য দিচ্ছেন বিভিন্ন আশ্বাস। আবার অনেক প্রার্থীকে ভালোবেসে নানা উপহার দিচ্ছেন ভোটার ও ভক্তরা। এমন উপহার পাওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজের ফেসবুক ওয়ালে পোস্ট করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের এমপি প্রার্থী নাহিদ ইসলাম।

বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে দেয়া পোস্টে নির্বাচনী প্রচারণা, প্রার্থীদের প্রতি ভোটারদের প্রত্যাশা এবং জুলাই আন্দোলন নিয়ে কথা বলেন তিনি। পোস্টে নাহিদ লিখেছেন, নির্বাচন এক নতুন অভিজ্ঞতা। প্রতিদিন ভোরে বের হই। সারাদিন হাঁটি রোদে, ধুলোয়, ভিড়ে। মানুষের সঙ্গে হাত মেলাই, কথা বলি, কথা শুনি। বক্তৃতা দিই, মসজিদে যাই। রাতে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় ফিরি।

এই দীর্ঘ দিনের সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতা হচ্ছে মানুষের ছোট ছোট উপহার। এই উপহারগুলোর ভেতর থাকে দরদ আর মমতা। কেউ চকলেট দেয়, কেউ আতর। কেউ নিজ হাতে শাপলা কলি বানিয়ে দেয়। এক বোন নিজ হাতে চুড়ি বানিয়ে দিয়েছে আমার স্ত্রীর জন্য।

কেউ কেউ হাতে বা পকেটে জোর করে কিছু টাকা গুঁজে দেয়। রাতে বাসায় এসে দুই পকেট ঝাড়লে পাওয়া যায় কিছু টাকা, আর নানা রকম উপহার, ভালোবাসার নীরব দলিল।
ওসমান হাদীর প্রতি মানুষের যে ভালোবাসা, তার ভাগিদার আমরাও হয়ে উঠছি। মানুষ আমাদের নিজের সন্তানের মতো দেখে, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়। ওসমান হাদীর শূন্যতা মানুষের মনে আজও পূরণ হয় নাই।

মানুষ জুলাইয়ের দিনগুলো ভোলেনি উল্লেখ করে তিনি আরও লিখেছেন, অনেকে স্মৃতিচারণ করে, বাড্ডা–রামপুরার আন্দোলন কীভাবে হয়েছিল, ব্র্যাক কিংবা কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির সামনে কীভাবে ছাত্র, জনতা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। রামপুরা ব্রিজ দখল করে রাখতো ইস্ট ওয়েস্ট ভার্সিটি, ইম্পেরিয়াল কলেজ ও আশপাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা। এই চর্চা শুরু হয়েছিল নিরাপদ সড়ক আন্দোলন থেকে।

ছাত্রদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল দোকানদার, চা-ওয়ালা, হকার। এলাকাবাসী আন্দোলনকারীদের ঘরে আশ্রয় দিয়েছিল, রাস্তায় পানি ও খাবার দিয়েছিল। মেইন রাস্তার পাশে অনেক মসজিদ ও মাদ্রাসার দেয়ালে গুলির দাগ দেখালো সেখানকার লোকেরা। মাদ্রাসার ছাত্ররা নেমেছিল বাড্ডা-ভাটারায়।

ঢাকার রাজপথ, অলি-গলি, সবখানেই জুলাই লেখা আছে। কখনো দেখা হয়ে যায় গুলিবিদ্ধ কোনো আহত যোদ্ধার সাথে। কিংবা শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। বাড্ডা–রামপুরার অনেক শহীদ পরিবার অভ্যুত্থানের পর ঢাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে, রাজনৈতিক হুমকি, মামলা-বাণিজ্য আর অর্থনৈতিক চাপের কারণে।

এক পিঠা বিক্রেতা খালার সঙ্গে কথা হলো। ভেবেছিলাম, হয়তো আমাকে চিনবেন না। কিন্তু উনি ভালো করেই চিনলেন। বললেন, আমি গুম হওয়ার পর অনেক দোয়া করেছিলেন।

অনেক মা আমাকে দেখে কেঁদেছেন। আন্দোলনের সময় আমাদের জন্য কতটা দোয়া করেছেন, সেই স্মৃতি টেনে এনেছেন। এক আন্টি এসে বললেন, এক দফা ঘোষণার দিন তিনি শহীদ মিনারে আমার ঠিক সামনেই ছিলেন। রামপুরা থেকে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন।

আন্দোলনের সময় ১৯ জুলাই আমি গুলশান–বাড্ডা থেকে পায়ে হেঁটে বনশ্রী বাসায় যাচ্ছিলাম। সেদিন মনে হয়েছিল বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করি। আন্দোলন শুরুর পর একদিনও বাসায় যাইনি।

বিকেলে বাসা থেকে বের হওয়ার পরপরই বনশ্রীতে গোলাগুলি শুরু হয়। আমার বাসার সামনেই একজন গুলিতে শহীদ হন সেই রাতেই আমি গুম হই। পরদিন কারফিউ ছিল। আমার জন্ম, গ্রাম, ভিটে, বড় হওয়া সবকিছু জড়ায় আছে বাড্ডা, রামপুরা, বনশ্রীতে। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারণায় এই এলাকাকে আমি নতুন করে চিনছি। অলি-গলি আর মানুষের সঙ্গে আরও গভীর আত্মীয়তা তৈরি হচ্ছে। কখনো দেখি ধানের শীষের অনেক সমর্থকরাও চুপ করে রাস্তায় বা বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে থাকেন, আমাকে দেখার জন্য।

প্রতিদিন শুনি মানুষের গল্প, বেঁচে থাকার লড়াই, কষ্ট আর প্রত্যাশা। কেউ ছেলের জন্য চাকরি চায়, কেউ মায়ের অপারেশনের জন্য সাহায্য। কেউ মসজিদের সামনের রাস্তাটা ঠিক করে দিতে বলে। কেউ তার দখলকৃত জমিটা উদ্ধার করে দিতে বলে। কোথাও তীব্র গ্যাস সংকট। নাই খেলার মাঠ, নাই ভালো ক্লিনিক। কেউ চায় সরকারি স্কুল। বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায়। প্রচণ্ড ট্রাফিক জ্যাম। আছে নিরাপত্তার শঙ্কা, অকার্যকর আইন শৃঙ্খলা ও ক্ষমতাবানদের দৌরাত্ম্য। ঢাকা শহরের সব সমস্যাই এখানে জড়ো হয়েছে।

মানুষ বলে ভোটের সময় রাজনীতিবিদরা আসে, বুকে জড়িয়ে ধরে এবং প্রতিশ্রুতি দেয়, ভোটের পর আর খোঁজ থাকে না। প্রতিশ্রুতি দেয়া এবং ভাঙাই যেন এ দেশের রাজনীতি। তারপরও মানুষ কথা বলে। প্রত্যাশা রাখে। প্রতিশ্রুতি শুনতে চায়। নতুন দিনের স্বপ্ন দেখে।

কেউ কেউ আমাকে বলেছেন, আমার ভেতর জড়তা আছে। আমি প্রথম দেখাতে অপরিচিত কারো সঙ্গে ইমোশন এক্সপ্রেস করতে পারি না। আবার অভিনয়ও পারি না। কিন্তু যেই ভালোবাসা মানুষ আমাকে দিচ্ছে একি পরিমাণ দরদ তাদের প্রতিও আমার আছে।

নির্বাচনের ফলাফল কী হবে, জানি না। কিন্তু রাজনীতি, হার-জিতের ঊর্ধ্বে মানুষের এই ভালোবাসা, নিজের এলাকাকে নতুন করে চেনা,  এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়ে থাকবে।

আইকে/টিকে

Share this news on:

সর্বশেষ

img
দিশাকে ঘিরে জল্পনায় নতুন মোড় Feb 06, 2026
img
চশমায় নতুন লুকে মুগ্ধতা ছড়াল ম্রুণাল ঠাকুর Feb 06, 2026
img
গুঞ্জনে ইতি টানলেন ম্রুণাল Feb 06, 2026
img
জামায়াত ক্ষমতায় যেতে পারবে না বুঝে ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে : মেজর হাফিজ Feb 06, 2026
img
রান্নাঘরে আড্ডা আর মজা- কনীনিকার সঙ্গে কোমর বেঁধে কুকিংয়ে স্বস্তিকা! Feb 06, 2026
img
বিএনপি ক্ষমতায় গেলে লবণের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হবে : সালাহউদ্দিন আহমদ Feb 06, 2026
img
আমি অবাক হয়েছি জামায়াত হিজড়াদের নিয়েও পলিসি করেছে : মোনামী Feb 06, 2026
img
নারী চরিত্রেই গল্পের প্রাণ খোঁজেন সন্দীপ রেড্ডি Feb 06, 2026
img
বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা, ৬ সরকারি কর্মকর্তাকে শোকজ Feb 06, 2026
img
এবার ২ জামায়াত প্রার্থীর হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট হ্যাকের অভিযোগ Feb 06, 2026
img
ও’ রোমিওর ক্লাইম্যাক্সে তীব্র দ্বন্দ্বের ঝলক Feb 06, 2026
img
গুলশানে এডিসিকে মারধর, গ্রেপ্তার ৫ Feb 06, 2026
img
আওয়ামী লীগের দায়িত্ব কীভাবে নেন নুর-প্রশ্ন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর Feb 06, 2026
img
কুষ্টিয়ায় বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষ, আহত ১১ Feb 06, 2026
img
ক্লান্ত দেহে বাসায় ফিরি, পকেটে থাকে ভালোবাসার নীরব দলিল: নাহিদ ইসলাম Feb 06, 2026
img
ফ্যামিলি কার্ড না দিয়ে চাঁদাবাজ ঠেকানোর কার্ড দেন : সারোয়ার তুষার Feb 06, 2026
img

ওসমান হাদি হত্যা

জাতিসংঘকে তদন্তের ‘প্রস্তাব দেবে সরকার’ Feb 06, 2026
img
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন, নারায়ণগঞ্জে জামায়াত প্রার্থীকে জরিমানা Feb 06, 2026
img
ভোটের পর ভ্যালেন্টাইন উদযাপনের কথা জানালেন অপু বিশ্বাস Feb 06, 2026
img

ইউরোপিয়ান ফুটবল

সবচেয়ে বেশি খরচ করা ক্লাবের তালিকায় শীর্ষে ম্যানসিটি Feb 06, 2026