হাওড়ে ঘুরতে যাওয়া ৩৪ বুয়েট শিক্ষার্থীদের আটকের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন

ঢাকা থেকে সিলেটের সুনামগঞ্জের হাওরে ঘুরতে যাওয়ার সময় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ (বুয়েট) ৩৪ শিক্ষার্থীকে আটক করে সন্ত্রাসদমন আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আটককৃত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকবৃন্দ।

মঙ্গলবার (১ আগস্ট) বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলন অভিভাবকবৃন্দ এ দাবি করেন।

সম্মেলন অভিভাবকবৃন্দ বলেন, আপনারা ইতিমধ্যে। জেনেছেন যে, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওড়ে ঘুরতে যাওয়া আমাদের সন্তান, আপনজন বুয়েটের ২৪ জন শিক্ষার্থীসহ মোট ৩৪ জন পর্যটককে পুলিশ আটক করে মামলা দায়ের করেছে। হঠাৎ এমন অনাকাঙ্ক্ষিত সংবাদ আমাদেরকে মর্মাহত করেছে। আমাদের সন্তানদের অন্যায়ভাবে আটক করা, সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা দায়ের আমাদের সন্তানদের শিক্ষাজীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। ফলে নিরুপায় হয়ে আজকে অভিভাবক হিসেবে আপনাদের সহযোগিতা পেতে আপনাদের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে।

আমাদের জ্ঞাতসারে গত শনিবার (২৯ জুলাই) আমাদের সন্তান/স্বজনেরা ক্যাম্পাসের বন্ধুদের সাথে সুনামগঞ্জের টাংগুয়ার হাওড়ে বেড়াতে যায়। যাওয়ার পরে সুনামগঞ্জ গিয়ে আরও বেশ কয়েকজন বুয়েটিয়ানকে পেয়ে তারা আনন্দিত হয় এবং তারা সবাই একত্রে ঘুরার কথা জানায়। রবিবার সন্ধ্যার পর থেকে তাদেরকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছিলো না। আমরা মনে করেছি ট্যুরে আছে, হাওড়ে এলাকায় হয়ত নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে ফোনে কল যাচ্ছে না। দীর্ঘক্ষণ তাদেরকে ফোনে না পেয়ে আমরা শঙ্কিত হয়ে পড়ি। এরপর প্রায় ৩ ঘন্টা পরে রাত ১০টার দিকে হঠাৎ ফোন করে আমাদের অনেকের কাছেই সন্তানরা তাদের নিজের ও গার্ডিয়ানের ন্যাশনাল আইডি কার্ডের নাম্বার জানাতে বলে। তারা জানায় যে তাদেরকে পুলিশ হাওড়ে নৌকায় ভ্রমনের সময় জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে আটক করে তাহিরপুর থানায় নিয়ে এসেছে এবং জিজ্ঞাসাবাদ করেছে; এরপর আইডি কার্ডের নাম্বার নেয়ার পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে, বলে জানিয়েছে। তারা ফোনে শুধু এতোটুকুই বলতে পারে। কিন্তু এরবেশী আর কথা বলতে দেয়া হয়নি, ফোন নিয়ে নেয়া হয়।


ফলে আমরা এরপর থেকে তাদের বিষয়ে খোঁজখবর জানার জন্য ওসি ও এসপিকে বারবার ফোন করেছি, কিন্তু উনারা কেউ ফোন রিসিভ করেননি। তাই, আমরা জানতেও পারছিলাম না কেন তাদেরকে আটক করা হয়েছে। অনেক উদ্বিগ্নতার পরে গতকাল বিকালে সংবাদ মাধ্যমের বরাতে আমরা জানতে পারি যে, তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা দেয়া হয়েছে। তারা নাকি নাশকতা সৃষ্টির পরিকল্পনার জন্য সেখানে গেছে। আমাদের সন্তানদের ব্যাপারে এমন অকল্পনীয় অভিযোগ শুনে আমরা যারপরনাই আশ্চর্যান্বিত হই। আমরা মনে করি, এরকম হাস্যকর ও বানোয়াট অভিযোগ সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও দুর্ভিসন্ধিমূলক। উল্লেখ্য, স্থানীয় ওসি এবং এসপিকে ফোন দেওয়ার পাশাপাশি আমরা রাত থেকে ভিসি স্যারকেও ফোন দিয়েছি অসংখ্যবার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা কারো সাথেই যোগাযোগে সক্ষম হইনি।


গতকাল বিকেলে আমাদের হাতে পৌঁছানো মামলার বিবরণীতে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ঘটিয়ে জননিরপত্তা বিঘ্নিত করা, জানমালের প্রতি ক্ষতি সাধন, রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকাণ্ডসহ ধর্মীয় জিহাদ সৃষ্টির মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অপরাধ ইত্যাদি অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই পুরো বিষয়টি আমাদেরকে প্রচন্ড উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এমন বাস্তবতায় গতকাল সন্ধ্যায় আমরা কয়েকজন অভিভাবক বিচ্ছিন্নভাবে বুয়েট ক্যাম্পাসে আসি ভিসি মহোদয়ের সাথে সরাসরি। সাক্ষাত করতে। ভিসি স্যারের সাথে সাক্ষাতের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করাকালীন আরও কয়েকজন অভিভাবক আসেন এবং এক পর্যায়ে ভিসি স্যারের পরিবর্তে মাননীয় ছাত্রকল্যাণ পরিচালকের সাথে আমাদের দেখা হয় এবং তাকে পুরো বিষয়টি অবহিত করি। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, ছাত্রকল্যাণ পরিচালক মহোদয় আমাদেরকে জানান যে, তাদেরকেও পুলিশের পক্ষ থেকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে গতকাল সোমবার বিকালে, এর আগে তারা বিষয়টি জানতেনই না। এরকম ষড়যন্ত্রমূলক প্রচেষ্টা কারা করছে এবং কোন উদ্দেশ্যে করছে, সে বিষয়টি নিয়ে যে আমরা উদ্বিগ্ন এবং আমাদের সন্তানদের শিক্ষাজীবন ক্যারিয়ার হুমকির সম্মুখীন সেটা আমরা ছাত্রকল্যান পরিচালক মহোদয়কে অবহিত করি। এ ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধও জানাই। তারা তাদের প্রসিডিউর অনুযায়ী চেষ্টা করবেন বলে আমাদেরকে আশ্বস্ত করেন।


একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, জব্দকৃত মালামাল হিসেবে কতগুলো জিনিসপত্র তাদের কাছ থেকে উদ্ধারের যে প্রসঙ্গ অবতারণা করা হয়েছে, এটি অত্যন্ত হাস্যকর এবং পরিষ্কারভাবে বানোয়াট বিষয়। তারা টার্ম-ব্রেকের ছুটির মাঝে বন্ধু-বান্ধবের সাথে ঘুরতে ওখানে গেছে। সাথে সদ্য এসএসসি পাশকৃত কয়েকজন আত্মীয়কেও বেড়ানোর জন্য সাথে নিয়ে গেছে। আর এভাবে করে টাঙ্গুয়ার হাওড়ে যেয়ে কেউ নাশকতার পরিকল্পনা করবে এমন অভিযোগও হাস্যকর। পরবর্তীতে কোর্টে তোলার সময়ে আইনজীবিদেরকে তারা জানিয়েছে যে, তাদের কাছে এবং সাথে থাকা মোবাইলে মামলার জব্দ তালিকায় উল্লেখিত উক্ত মামলা সাজাতে পুলিশের যেসব কাগজপত্র প্রত্যাশিত, সেসবের কিছুই না পেয়ে তাদের সামনেই জব্দকৃত সেসব অনাকাঙ্ক্ষিত মালামাল সংগ্রহ করা হয়েছে এবং ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড দিয়ে প্রিন্ট করা হয়েছে তাদের মামলা সাজানোর জন্য।

আমরা চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি, কোন ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের সাথে আমাদের সন্তানেরা জড়িত নয়। ছোটবেলা থেকে মেধাবী ছাত্র হিসেবে এবং ভালো সন্তান হিসেবে আমরা তাদের ব্যাপারে গর্ব অনুভব করি। ছোটবেলা থেকেই তাদের পড়ালেখার প্রতি ঝোক ছিল; রাজনীতিসহ এজাতীয় কোন কাজের সাথে তাদের সংশ্লিষ্টতা ছিল না কখনই। উপরন্তু, বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়ায় আমরা সর্বদাই তাদেরকে এ ব্যাপারে সাবধান করে গিয়েছি এবং তারাও রাজনীতিমুক্ত হিসেবেই ছিল। অতএব, তারা কোন ধরনের রাজনীতির সাথে জড়িত, এ ধরনের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমরা পরিষ্কার ভাষায় বলছি তারা সাধারণ শিক্ষার্থী মাত্র। কোন ষরযন্ত্রের অংশ হিসেবে তাদের বিরুদ্ধে এমন ভয়ঙ্কর মামলা সাজানো হলো, আমাদের বোধগম্য নয়।

এমন পরিস্থিতিতে, শিক্ষার্থীদের পরিবার হিসেবে আমরা মানসিকভাবে বেদনাদায়ক সময় পার করছি ও তাদের ভবিষ্যত জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শংকায় আছি। দ্রুত তাদের জামিন প্রদান ও মামলা থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য বিচারবিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে দাবী জানাচ্ছি।

এ ব্যাপারে বুয়েট প্রশাসন, বুয়েটের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকবৃন্দ, বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীবৃন্দ এবং সাংবাদিক ভাইদের মাধ্যমে আমরা দেশবাসীর কাছে আমাদের নিরাপরাধ সন্তানদের পাশে থাকার জন্য সহযোগিতা ও দোয়া কামনা করছি।

Share this news on: