এনসিপির কৌশলের অভাব আছে, জামায়াত জোটে আধিপত্য বিস্তার করবে: মাহফুজ আলম

নতুন দল হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কৌশলের অভাব রয়েছে বলে মনে করেন সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। তাঁর ধারণা, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা যে জোটের সঙ্গী এনসিপি; সেই জোটে আধিপত্য বিস্তার করবে জামায়াতই।

ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য উইক–কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাহফুজ আলম এসব কথা বলেন। সম্প্রতি ওই সাক্ষাৎকার প্রকাশ হয়। এরই মধ্যে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামহ বাংলাদেশের আরও কয়েকজন নেতার সাক্ষাৎকারও প্রকাশ করেছে উইক।

উপদেষ্টার পদ ছাড়ার পর কেন রাজনৈতিক দলে যোগ দেননি– সে প্রশ্নে মাহফুজ বলেন, আমি পুরোনো দলগুলোর সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার পরিবর্তে নতুন শক্তির একটি বৃহত্তর জোটের অপেক্ষায় ছিলাম। এনসিপি জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার পর, আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং কৌশলের অভাব রয়েছে। জামায়াত শেষ পর্যন্ত এই ধরনের যেকোনো জোটে আধিপত্য বিস্তার করবে।

এক পর্যায়ে তিনি বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন জানিয়ে বলেন, আমার পদত্যাগের পর আমি বিএনপির সাথে কথা বলেছিলাম। কিন্তু তাদের সিদ্ধান্ত ততক্ষণে চূড়ান্ত হয়ে গেছে।
জামায়াতের সঙ্গে জোট প্রসঙ্গে এরআগে একই সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, বিশেষ করে নারী অধিকার ও সংখ্যালঘু প্রসঙ্গে আপস করা হলে এই জোট টিকবে না।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে মাহফুজ আলম বলেন, আজ বাংলাদেশ এক পরিচিত চক্রে আটকা পড়েছে: সবাই কাউকে না কাউকে দোষারোপ করার জন্য খুঁজছে। গণঅভ্যুত্থানের পর সর্বত্রই এমনটা ঘটে।

তিনি বলেন, উপদেষ্টা পরিষদে যোগ দেওয়ার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি - সারা দেশের মানুষের সাথে দেখা করেছি, বিশেষ করে সংখ্যালঘু নেতাদের সাথে। আমাকে তাদের আশ্বস্ত করতে হয়েছিল, জুলাই-সমর্থিত, ছাত্র-সমর্থিত সরকারের অধীনে তারা নিরাপদ থাকবে। কিন্তু তা হয়নি। সময়কালটি ছিল উত্তেজনাপূর্ণ এবং অস্থির।

মাহফুজ আলম বলেন, সরকারের ভেতর থেকে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, পুরোনো রাজনৈতিক সমঝোতার চক্র অর্থপূর্ণ পরিবর্তন চায় না। এটাই নিশ্চিত।

আপনি যখন ক্ষমতার চক্র বলেন, তখন আপনি কি কেবল আওয়ামী লীগ, নাকি বিএনপি এবং জামায়াতের কথা বলছেন– এ প্রশ্নে সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, তাদের সকলের। আসলে কোনো পার্থক্য নেই। আমি শক্তিশালী প্রশাসনিক পদে থাকা লোকদের সাথে দেখা করেছি, কিছু জামায়াত-বিএনপি ব্যাকগ্রাউন্ডের- যারা এই সমঝোতার অংশ ছিল।


নাহিদ ইসলাম বলেন, একবার আপনি একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে পৌঁছালে, পরিবর্তন চাওয়া বন্ধ করে দেন। আপনি ভাবেন, আমরা এসেছি; পরবর্তী সরকারকে সংস্কার নিয়ে কাজ করতে দিন।
রাজনীতি আবারও ১৯৭১ সালের আখ্যানে আটকা পড়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আকাঙ্ক্ষা কোথাও দেখা যাচ্ছে না।

প্রথম আলো এবং দ্য ডেইলি স্টারের ওপর আক্রমণকে আপনি কীভাবে দেখেন? এটা কি বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ নয়– এই প্রশ্নে মাহফুজ আলম বলেন, হ্যাঁ, অবশ্যই। এটা কোনো সাধারণ চরমপন্থী আক্রমণ ছিল না। এতে একাধিক স্তর জড়িত ছিল—কিছু ছাত্রকে ব্যবহার করা হয়েছিল, কিন্তু তারা এর পেছনের চালিকাশক্তি ছিল না। সরকারের ভেতরে এবং বাইরের বিভিন্ন ব্যবসায়িক গোষ্ঠী, রাজনৈতিক স্বার্থ এবং উপদল ভূমিকা পালন করেছিল। অনেক আক্রমণকারী এমনকি ঢাকারও ছিল না। তাদের কে এনেছিল? এটাই আসল প্রশ্ন।

আপনি বিরক্ত বোধ করছেন যে ১৯৭১ আজকের রাজনীতিতেও আধিপত্য বিস্তার করছে। আপনি কি ১৯৭১–কে প্রত্যাখ্যান করার চেষ্টা করছেন– এ প্রশ্নে তিনি বলেন, মোটেও না। ১৯৭১ আমাদের প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমান একজন জাতীয় বীর। কিন্তু আমরা যা বিরোধিতা করি তা হলো ১৯৭১ সালের অপরিহার্যতা-এটিকে আওয়ামী লীগের পারিবারিক আখ্যানে পরিণত করা। মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনগণের সংগ্রাম, কোনো একক দলের বা পরিবারের নয়।

মাহফুজ আলম বলেন, শেখ মুজিবকে পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। ছয় দফা আন্দোলন এখনও আছে। আমরা যা প্রশ্ন করেছিলাম তা হলো কীভাবে দলীয় আখ্যানগুলোকে সাংবিধানিক করা হয়েছিল- কীভাবে একটি পরিবারকে সম্মিলিত সংগ্রামের ওপরে তুলে ধরা হয়েছিল। ভবিষ্যতের যেকোনো সরকার সংস্কার করবে, মুছে ফেলবে না।

যদি আপনি জামায়াতের প্রতি মোহভঙ্গ হন এবং এনসিপির প্রতি আস্থাশীল না হন, তাহলে জনগণের জন্য কে প্রকৃত আশার প্রতিনিধিত্ব করে বলে আপনার মনে হয়- এমন প্রশ্ন করা হয় মাহফুজ আলমকে।

উত্তরে সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, বিএনপি এবং জামায়াত উভয়েরই বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন এবং দুর্বলতা আছে। আসল প্রশ্ন দলগুলোর নয়-এটা পরিবর্তনের বিষয়। এনসিপির বাইরে জুলাইয়ের উৎপত্তির একাধিক প্ল্যাটফর্ম আছে। আমরা একই মনোভাব পোষণ করি। আমরা কোনো দলে যোগদান করি বা না করি, আমরা রাজনীতি, প্রতিষ্ঠান এবং সংবিধানে কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য চাপ অব্যাহত রাখব। সেই সংগ্রাম আমাদের আজীবন স্থায়ী হবে।

টিজে/টিকে

Share this news on:

সর্বশেষ

img
চীনকে মোকাবিলায় শক্তিশালী ড্রোন তৈরি করছে তাইওয়ান ও যুক্তরাষ্ট্র Feb 06, 2026
img
গাজীপুরে বিএনপি ও জামায়াত সংঘর্ষ, আহত ৫ Feb 06, 2026
img
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈঠকের আগে বিশ্ববাজারে তেলের দামে পতন Feb 06, 2026
img
রোনালদোকে কড়া হুঁশিয়ারি দিল সৌদি প্রো লিগ Feb 06, 2026
img
হাতিরঝিলে পুলিশের এডিসিকে মারধরের মামলায় গ্রেপ্তার ৫ Feb 06, 2026
img
বন্দরের ১৫ কর্মচারীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ তদন্তের আবেদন Feb 06, 2026
img
যোগীর নির্দেশে উত্তরপ্রদেশে মনোজ বাজপেয়ীর বিরুদ্ধে মামলা! Feb 06, 2026
img
আরও ৪৪৭৬ কোটি টাকা বাজার মূলধন বেড়েছে ডিএসইর Feb 06, 2026
img
২য় ‘বিবাহ অভিযান’ বিতর্কের পর বিধানসভায় হিরণ Feb 06, 2026
img

ইপিএ স্বাক্ষর

বাংলাদেশ-জাপান বাণিজ্য চুক্তির ঐতিহাসিক মুহূর্ত আজ Feb 06, 2026
img
বিশ্বকাপের আগে অজি শিবিরে বড় ধাক্কা Feb 06, 2026
img
শরিয়তকে প্রাধান্য দিয়েই দেশ পরিচালনা করা হবে: চরমোনাই পীর Feb 06, 2026
img
ডি ভিলিয়ার্সের চোখে বিশ্বকাপের চার সেমিফাইনালিস্ট Feb 06, 2026
img
ভোটকেন্দ্রের সব তথ্য এখন মোবাইলে, ইসির নতুন অ্যাপ চালু Feb 06, 2026
img
থামছে না 'ধুরন্ধর'র ঢেউ, ওটিটি-তে নতুন ইতিহাস! Feb 06, 2026
img
স্বর্ণের পর এবার কমল রুপার দামও Feb 06, 2026
img
আজ বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের প্রয়াণ দিবস Feb 06, 2026
img
আর্থিক নিয়ম ভাঙায় শাস্তি পেল হামজার ক্লাব Feb 06, 2026
img
দেশের বাজারে স্বর্ণের দামে বড় পতন Feb 06, 2026
img
ঢাকার শীত নিয়ে আবহাওয়া অফিসের নতুন তথ্য Feb 06, 2026