আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে ক্রমশঃ শীতল হতে থাকা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে বিমসটেক সম্মেলনের সাইডলাইনে দুই দেশের সরকার প্রধানের বৈঠক।
বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গতকাল (শুক্রবার) দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করার জন্য প্রথমবারের মতো মিলিত হন। বহুল প্রত্যাশিত এই বৈঠকে অধ্যাপক ইউনূস বাংলাদেশ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি উত্থাপন করেন, তার মধ্যে শেখ হাসিনার ভারত থেকে প্রত্যর্পণ ও সীমান্ত হত্যা অন্যতম। একইভাবে ভারতের পক্ষ থেকেও প্রধানমন্ত্রী মোদি বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিপীড়নে উদ্বেগ প্রকাশ করে আহ্বান জানিয়েছেন সম্পর্ক খারাপ হতে পারে এমন বক্তব্য পরিহার করতে।
সেইঅর্থে প্রতিবেশি দুই দেশের সরকার প্রধানের বৈঠকে পরস্পরের উদ্বেগ প্রকাশিত হলেও বিশ্লেষকরা একে দেখছেন গত আট মাস ধরে চলতে থাকা শীতল সম্পর্কে বরফ গলার শুরু হিসেবে। একটি ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত মতামতে এমনি অবস্থান তুলে ধরেছেন বিশ্লেষকরা।
ভারতীয় সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অর্ক ভাদুড়ি আলোচিত ইউনুস-মোদি বৈঠক প্রসঙ্গে বলেন, ‘এই বৈঠক নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। আমার মনে হয় এটা প্রত্যাশিত ছিল। কারণ কোনও দেশের পক্ষেই তাদের প্রতিবেশী পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।’
‘‘এই বৈঠককে এখনই ‘সফল’ বলা যাবে কিনা তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। একইভাবে, আমি এই বৈঠককে ‘ব্যর্থ’ বলতেও রাজি নই। কিন্তু কয়েক মাস ধরে ঠান্ডা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পর, এই বৈঠক নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। দুই নেতা কথা বলেছেন, তারা একে অপরের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন - এটি আমাকে আশাবাদী করে তোলে’-যোগ করেন অর্ক ভাদুড়ি।
তিনি মনে করেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক সমতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। অবৈধ সীমান্ত অতিক্রম যেমন নিন্দনীয়, তেমনি নির্বিচারে সীমান্ত হত্যা বন্ধ করাও গুরুত্বপূর্ণ। উভয় দেশ যাতে তাদের ন্যায্য পানির ভাগ পায় তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ভারত বা বাংলাদেশ কারোরই একে অপরের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ইতিহাস ও রাজনীতির বিষয়ক গবেষক আলতাফ পারভেজ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বাংলাদেশে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাকে ভারতের সাথেই যোগাযোগ করতে হবে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, এই বৈঠকের ফলাফল তাৎপর্যপূর্ণ এবং গঠনমূলক উভয়ই হবে। ভারতে বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রচুর ভুল তথ্য এবং প্রচারণা চলছে। তবে, এই বৈঠকের পরে, এই ধরণের নেতিবাচক বক্তব্য সম্ভবত হ্রাস পাবে।’
ঐতিহাসিকভাবে প্রেক্ষাপট তুলে ধরে এই গবেষক বলেন, ‘শীতল যুদ্ধের সময়েও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রায়শই কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে গেছে।তাদের মতো কঠোর প্রতিপক্ষরা যদি পেরে থাকেন তবে বাংলাদেশ ও ভারত কেন নয়?’
অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্টডক্টরাল ফেলো ড. মুবাশ্বের হাসান বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস ও প্রধানমন্ত্রী মোদীর মধ্যে বৈঠককে বরফ গলার সূচনা বলা যায়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ভারত বর্তমান সরকারের সাথে যোগাযোগ শুরু করেছে। এটি তাদের বিদেশ নীতিতে একটি বড় পরিবর্তনকে দৃশ্যমান করে।’
গবেষক রেজাউর রহমান লেনিন অবশ্য মনে করেন, এই বৈঠক ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্কের উপর কীভাবে প্রভাব ফেলবে তা দেখার বিষয়।
তিনি বলেন, ‘যদিও মনে হচ্ছে ভারত ধীরে ধীরে আমাদের গ্রহণ করছে কিন্তু আলোচনার পরিণতি কি দাঁড়াবে এবং এটি ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্কের উপর কীভাবে প্রভাব ফেলবে-ইতিবাচক না নেতিবাচক তা এখনও দেখার বিষয়। ভারতীয় তাদের স্বার্থ নিরূপণে নিজস্ব হিসাব-নিকাশ করবে, তবে বাংলাদেশকে তাদের অবস্থান সম্পর্কে খুব সতর্ক থাকতে হবে, বিশেষ করে শেখ হাসিনা এবং সীমান্ত হত্যার বিষয়ে। আমি বিশ্বাস করি আমাদের আন্তর্জাতিক ফোরামে এই বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে, কারণ আমাদের সরকারের অপরাধীদের বিচার করার নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব রয়েছে।’
এমআর/এসএন