মনে আছে 'কথাবন্ধু'দের কথা? রাতভর ভূত এফ এম শোনা, সকালে অফিসে যাওয়ার পথে ব্যক্তিগত গাড়িতে অফিসে বা অন্য কোথাও যাওয়ার পথে, বিকাল-সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার পথে, হাতের মোবাইলে এফএম রেডিও চালিয়ে শোনা যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল।
এক সময় ছিল যখন এফএম রেডিওর সুর আর তারুণ্যের কণ্ঠ মিলেমিশে তৈরি করত এক দারুণ ম্যাজিক। স্মার্টফোন বা ইউটিউবের যুগে হয়তো সেই দিনের কথা অনেকের কাছে গল্প মনে হবে, কিন্তু যারা সেই সময়টা দেখেছেন, তারা জানেন, রেডিও জকি বা আরজেদের নিয়ে কী দারুণ ক্রেজ ছিল!
রাতভর গল্প আর গান
বাংলাদেশের এফএম রেডিওর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে উঠেছিল ২০০৭-২০১০ সালের দিকে। তখন সন্ধ্যা হলেই তারুণ্যের একটি বড় অংশের কাজ ছিল রেডিওর নব ঘুরিয়ে পছন্দের স্টেশনে টিউন করা। আরজেরা যেন শুধু অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করতেন না, তারা হয়ে উঠেছিলেন বন্ধু, বড় ভাই বা প্রিয় বান্ধবী। রাতের শো-গুলো ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়। আরজে কিবরিয়ার 'লাভ স্ট্রোক' ছিল তখন রীতিমতো ট্রেন্ড। গভীর রাতে যখন চারদিক নিস্তব্ধ, হাজার হাজার শ্রোতা তখন তাদের প্রিয় আরজের কণ্ঠ শুনতে রেডিও খুলে বসে থাকত। প্রেমের চিঠি, ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান চাওয়া বা নিছক আড্ডার জন্য রাতভর কল আসত স্টেশনে। শ্রোতাদের গল্পগুলো যখন আরজেরা তাদের নিজস্ব ভঙ্গিতে পড়ে শোনাতেন, তখন মনে হতো যেন তারা আমাদেরই গল্প বলছেন।
শুধু রাতই নয়, দিনের বেলায়ও আরজেদের শো ছিল সমান জনপ্রিয়। তখন আরজে নীরব, আরজে মিঠু বা আরজে রাজু-এর মতো নামগুলো মুখে মুখে ঘুরত। তাদের কথা বলার ধরণ, তাদের নিজস্ব স্টাইল, এমনকি তাদের স্লোগানগুলোও ছিল তরুণদের কাছে দারুণ আকর্ষণীয়। অনেক আরজে নিজস্ব চরিত্র তৈরি করে নিয়েছিলেন, যেমন আরজে নীরব খানের 'নিরবতা' নামক শো-এর চরিত্রটি। এই শোতে তিনি শ্রোতাদের পাঠানো চিঠি পড়ে শোনাতেন, যা ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়।
এফএম রেডিওগুলো নিয়মিত আয়োজন করত বিভিন্ন ইভেন্ট, যেখানে আরজেরা সরাসরি শ্রোতাদের সঙ্গে দেখা করতেন। তখন তাদের এক ঝলক দেখার জন্য হাজার হাজার মানুষের ভিড় হতো। এটা ছিল আরজেদের জন্য তারকাখ্যাতি পাওয়ার মতো এক বিষয়। সোশ্যাল মিডিয়ার এত প্রচলন না থাকায়, রেডিও ছিল যোগাযোগ এবং তারকাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের প্রধান মাধ্যম।
আরজেরা শুধু গান বাজাতেন না, তারা জীবনের গল্প বলতেন। তারা শ্রোতাদের ছোট-বড় সব সমস্যার কথা মন দিয়ে শুনতেন এবং নিজেদের মতো করে পরামর্শ দিতেন। কখনো কখনো আরজেরা এমন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন, যা সমাজের প্রচলিত ট্যাবু ভেঙেছিল। তাদের শোতে থাকত নতুন বই, নতুন সিনেমা বা ফ্যাশন নিয়ে আলোচনা। রেডিও যেন শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, ছিল তরুণ প্রজন্মের জন্য এক শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্মও।
এভাবেই, এফএম রেডিওর সোনালি দিনগুলোতে আরজেরা হয়ে উঠেছিলেন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের কণ্ঠ ছিল শ্রোতাদের নিত্য দিনের সঙ্গী, তাদের কথাই ছিল অনুপ্রেরণা। সেই সোনালি সময়ের কথা আজও অনেকে মনে করেন এক গভীর ভালো লাগা নিয়ে।
কিন্তু সময়ের স্রোতে এই জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। এর প্রধান কারণ ছিল ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং স্মার্টফোনের ব্যবহার বৃদ্ধি। ইউটিউব, স্পটিফাই, অ্যাপল মিউজিকের মতো অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো আসার পর মানুষ তাদের পছন্দের গান এবং কন্টেন্ট নিজেদের পছন্দমতো সময়ে শুনতে শুরু করে। এতে রেডিওর ওপর নির্ভরশীলতা কমে যায়।
তবে আরজে পেশাটি সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়নি, বরং তার বিবর্তন হয়েছে। অনেক জনপ্রিয় আরজে এখন নতুন প্ল্যাটফর্মে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছেন। আরজে কিবরিয়া বর্তমানে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কাজ করছেন, যেখানে তিনি তার পুরোনো স্টাইলে গল্প বলেন। আরজে রাজু একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আরজে নীরব খান এখন বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন।
রেডিও থেকে পডকাস্ট
রেডিও জকিদের নতুন ঠিকানা এখন পডকাস্ট। পডকাস্ট হলো একটি অনলাইন অডিও শো, যা আপনি যেকোনো সময়, যেকোনো জায়গা থেকে শুনতে পারেন। আরজেরা তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পডকাস্টের মাধ্যমে গল্প, আলোচনা বা গান নিয়ে নতুন কন্টেন্ট তৈরি করছেন। এখনকার পডকাস্টগুলোতে তারা নিজেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, জীবনের গল্প বা বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিয়ে কথা বলেন, যা শ্রোতাদের মধ্যে একটি গভীর সংযোগ স্থাপন করে।
এভাবে, বাংলাদেশের এফএম রেডিওর সোনালি দিনগুলো স্মৃতি হয়ে থাকলেও, আরজেদের কণ্ঠ এবং তাদের কথা বলার ধরণ আজও বেঁচে আছে নতুন রূপে, নতুন মাধ্যমে। এফএম রেডিও থেকে পডকাস্টের এই বিবর্তন প্রমাণ করে যে, মাধ্যম পরিবর্তন হলেও storytelling বা গল্প বলার শিল্প কখনো হারায় না, বরং নতুন রূপে নিজেকে প্রকাশ করে।
এফপি/ টিএ